
বাতের ইংরেজি হল আর্থাইটিস। এটি গ্রীক শব্দ আর্থো ও আইটিস থেকে এসেছে। আর্থো অর্থ সন্ধি আর আইটিস অর্থ প্রদাহ। আজকে আমি বাত বা আর্থাইটিসের বিভিন্ন প্রকার, কারণ ও লক্ষ্মণ নিয়ে আলোচনা করবো যাতে আপনি কি ধরনের বাত রোগে আক্রান্ত তা সহজেই চিন্হিত করে চিকিৎসকে চিকিৎসা প্রদানে সহায়তা করতে পারেন।বাত বা আর্থাইটিস বিভিন্ন প্রকার হয়ে থাকে তার মধ্যে খুবই কমন কয়েকটি বাত নিয়ে আলোচনা করবো।
রিউমাটয়েড আর্থাইটিস বা সন্ধি বাতঃ এটি অল্প বয়সি মহিলাদের মধ্যে বেশি হয়ে থাকে। কি কারণে হয়ে থাকে তা এখনো জানা সম্ভব হয়নি। এটি অটো ইমিউন ডিজিস বিধায় আমাদের ইমিউনিটি সিস্টেমের ভালো ভালো জয়েন্ট বা সন্ধি গুলোতে আক্রমণ বা প্রদাহ সৃষ্টি করে যার ফলে রিউমাটয়েড আর্থাইটিস বা সন্ধি বাতের মত রোগ হয়। এই রোগ হলে আমাদের হাত ও পায়ের ছোট ছোট গিট বা জয়েন্ট ব্যাথা হয়, ফুলে যায়, লালচে হয়ে যায়, হাত মুষ্টি করা যায় না, এছাড়া কব্জি কনুই এবং চোয়ালে ব্যাথা হয়।জয়েন্ট গুলো গরম থাকে, গায়ে জ্বর থাকে ও ক্ষুধা মন্দা দেখা দেয়। রক্তের ইএসআর, আরএ ফ্যাক্টর পজিটিভ হলে আপনি নিশ্চিত হতে পারেন যে আপনি সন্ধি বাতে আক্রান্ত।
অস্টিও আথ্রাইটিসঃজেনেটিক বা জন্মগত প্রবৃত্তি এই রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এ ক্ষেত্রে যে সকল জয়েন্ট বা সন্ধির উপর শরীরের চাপ বেশী পড়ে সে সকল সন্ধিগুলো বেশী আক্রান্ত হয়ে থাকে। যেমন হাঁটু, হিপ । তাছাড়া হাত ও পায়ের জয়েন্টগুলোও আক্রান্ত হয়। এমনকি মানব দেহের অতীব গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্পাইন বা মেরুদ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।যখন বয়সগত কারণে হাঁটু সন্ধি আক্রান্ত হয় তখন এটিকে প্রাথমিক বা প্রাইমারি আথ্রাইটিস হিসেবে ধরে নেয়া হয়। যদি অতীত কোন ঘটনার জন্য এ রোগ দেখা দেয় তবে এটাকে সেকেন্ডারি অস্টিও আথ্রাইটিস হিসেবে ধরে নেয়া হয়। সেকেন্ডারি আথ্রাইটিস নিম্নলিখিত যে কোন কারণে হতে পারে। যেমন ট্রমা, জয়েন্ট সার্জারি, স্থুলতা, গেঁটে বাত, বহুমূত্র, হরমোনাল সমস্যা (বিশেষত গ্রোথ হরমোন) ইত্যাদি।
অস্টিও আথ্রাইটিস-এর লক্ষণসমূহ :১। আক্রান্ত সন্ধিস্থানে ব্যথা এবং আড়ষ্ট হওয়া।২। আক্রান্ত স্থান ফুলে যাওয়া এবং উত্তপ্ত হওয়া।৩। সন্ধিস্থানে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করা।৪। পুনঃপুনঃ ব্যবহারে জয়েন্টের ব্যথা বৃদ্ধি পাওয়া।৫। বিশ্রামেও ব্যথা বৃদ্ধি পেতে পারে (সিভিয়ার কেসের ক্ষেত্রে)।৬। সন্ধিগুলোর গতিশীলতা সীমিত হয়ে যাওয়া।৭। উবু হয়ে বা আসনপিঁড়ি হয়ে বসার অক্ষমতা।৮। হাতের আঙ্গুলের ছোট ছোট সন্ধিগুলোর বিশেষ পরিবর্তন।৯। স্পাইন অস্টিও আথ্রাইটিস এর কারণে ঘাড় ব্যথা ও আড়ষ্ট হওয়া।১০। চরম পর্যায়ে কোন কোন ক্ষেত্রে তীব্র যন্ত্রণা ও আবশ্যকতা ।
গেটে বাতঃ এটি হওয়ার প্রধান কারণ হলো আমাদের শরীরে যদি রক্তের ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যায় তখন গিঁটে গিঁটে তা জমাট বেঁধে এক প্রকার প্রদাহ সৃষ্টি করে যা গেঁটে বাত নামে পরিচিত। এক্ষেত্রে জয়েন্টে ব্যাথা হয়, পায়ের গোড়ালিতে ব্যাথা হয়, হার্টের সমস্যা দেখা দেয়। রক্তের ইউরিক অ্যাসিড টেস্ট করিয়ে জেনে নিন আপনি গেঁটে বাতে আক্রান্ত কিনা।
লাম্বাগো বা কটি বাতঃ সাধারণত কোমরের বাত ব্যাথাকে লাম্বাগো বা কটি বাত বলে। ভারী কোন বস্তু তুলতে গিয়ে কোমরে ব্যাথা পেলে অথবা হারনিয়াটেড বা স্লিপের ডিস্ক কোন কারণে সরে গেলে সেক্ষেত্রে কোমরের ব্যাথা বা কটিবাত হয়ে থাকে। এক্সের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়।
স্পনডিলাইটিস বা মেরুদণ্ড প্রদাহঃ মেরুদণ্ড বা স্পাইনাল কর্ড তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। সারভাইকেল এরিয়া, থোরাসিক এরিয়া, লাম্বার এরিয়া। এই এরিয়ার যেখানে প্রদাহ হবে সে জায়গার নাম অনুযায়ী প্রদাহ গুলির নামকরণ করা হয়ে থাকে। যেমন সারভাইকেল স্পনডিলাইটিস, থোরাসিস স্পনডিলাইটিস, লাম্বার স্পনডিলাইটিস। এক্ষেত্রে ঘাড় ডানে-বামে সামনে পিছনে করা যায় না। থোরাসিসের ক্ষেত্রে পিঠে চাপা বোধহয় সামনে পিছনে ঝুঁকা যায় না। লাম্বারের ক্ষেত্রে কোমরে ব্যথা করে। এক্সের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়। এ রোগের যন্ত্রনা পিঠে ও ঘাড়ে উভয় বাহুর সন্ধিতে, কোমরে প্রথমে পরিলক্ষিত হয়। আবার যদি কোন কারনে স্পাইনের ত্রুটি দেখা দেয়, তবে সেক্ষেত্রে নার্ভের উপর চাপ পড়লে শরীরের যে কোন অংশে যন্ত্রনা দেখা দিতে পারে।
★কি কারনে হয়ঃএর কারন বহুবিধ, তবে মানসিক চাপ,অতিরিক্ত পরিশ্রম এবং অপুষ্টির জন্য সাধারনত এ রোগকে দায়ী করা হয়। আবার কোন কারনে আঘাত বা টিউমারের কারনে ও এ রোগ দেখা দিতে পারে।
★স্পন্ডিলাইটিস হলে যে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তা হলোঃঅনেক সময় এ রোগের ফলে ঘাড় আক্রান্ত হয়ে শক্ত হয়ে যায়। আবার কখনো এ রোগের প্রভাবে শ্বাস- প্রস্বাসে সমস্যা হয়।শরীরের সন্ধিগুলোতে তীব্র যন্ত্রনা দেখা দেয়। যৌন জীবনেও এর বিরুপ প্রভাব পড়তে থাকে। পিঠ, ঘাড়,কাঁধ ও বাহুর সন্ধিগুলোতে এবং কোমরের যন্ত্রনারই তীব্রতা বেশী থাকে। কখনো রোগীর যন্ত্রনা এত তীব্র হয় যে, তা সৈহ্যের বাইরে চলে যায়। নার্ভের জন্য কখনো হৃদপিন্ডে যন্ত্রনার প্রকাশ পায়।বুকের পাঁজরের সাথে মেরুদণ্ডেরর সন্ধিগুলোশক্ত হয়ে পড়ে বলে পেটেও মাঝে মধ্যে যন্ত্রনা পরিলক্ষিত হয়। স্পন্ডিলাইটিস দেখা দেয়ার পরপেশীর শক্তিগুলো কমে যায়, এবংক্রমান্বয়ে হাড়ক্ষয় হতে থাকে। আবার হাড়বৃদ্ধি ও ঘটে অনেকটা উপরোল্লিখিত কারনেই। হাড়বৃদ্ধি হলে নার্ভে চাপ পড়ায় রোগী নড়াচড়া করতে পারেনা। তাই বেশীরভাগ ক্ষেত্রেেই রোগী বিছানায় শুয়ে উপুড় হয়ে মল- মুত্র ত্যাগে বাধ্য হয় এবং উপুড় হয়ে সারাক্ষণ মাত্রাতিরিক্তযন্ত্রনা ভোগ করে।অনেকে সুচিকিৎসার অভাবে সারা জীবনের জন্য পংগুত্ব বরন করতে হয়। এ রোগীদের নামাজ পড়তে অসুবিধা হয়। কারন সামনে ঝুকতে পারে না।।
★এ রোগীর করনীয় বিষয় হলো :সর্বদা পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহন,প্রোটিন,কার্বোহাইড্রেড ও ভিটামিনের উপর দৃষ্টি রাখা জরুরী।মেরুদণ্ডে আঘাত পায় এমন কাজ বর্জন, দৈহিক পরিশ্রম মাত্রাতিরিক্ত না করা, কাপড়-চোপড় ধৌত না করা, সারাক্ষণ বিশ্রামে থাকা, হাতে কিংবা মাথায় ভারী জিনিস বহন অনুচিত। নিয়মিত ব্যায়াম দরকার, তবে নিয়ম মাফিক হওয়া চাই।শোবার বিছানা রোগীর যাতে যন্ত্রনা না বাড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।সর্বোপরি এ রোগ নিরসনে একজন অভিজ্ঞ হোমিওকনসালটেন্ট এর পরামর্শ নিন
★এ রোগের চিকিৎসাঃএলোপ্যাথিতে হাড়ক্ষয়, হাড়বৃদ্ধি ও স্পন্ডিলাইটিস এর চিকিৎসা হয়না বলে অপারেশন করে সাময়িক যন্ত্রনা কমানো হয়, তাও আবার লক্ষ লক্ষ টাকা গুনতে হয় এর প্রেক্ষিতে। তাছাড়া নির্দিষ্ট সময় পর পুনরায় একই ব্যাাধিতেরোগী আক্রান্ত হয় ও নাট-বল্টু গুলো পুনরায় প্রতিস্হাপন করা লাগে। এরফলে রোগী জীবন ভর ব্যথা নাশক ওষুধ সেবন করতে হয়, না হয় রোগীর চিৎকারে কেউ স্হির থাকা যায়না। দীর্ঘদিন হাই পেইন কিলার ওষুধ সেবনে কিডনি সমস্যা সহ শরীরের অন্য অংগে বিভিন্ন নতুন রোগের সৃষ্টি হয়।মোটকথা রোগীর জীবন দুর্বিষহ করে তোলে।
সাইটিকা বাতঃ আমাদের কটি বা মাজা থেকে পিছনের দিকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা মোটা পুরু নার্ভ থাকে। এই নার্ভ কোন কারণে আঘাত প্রাপ্ত হলে অথবা ডিস্ক ক্ষয়প্রাপ্ত হলে সাইটিকা বাত বা সাইটিকা ব্যাথা হয়ে থাকে। এক্সের করে নিশ্চিত হওয়া যায়।
বাতজ্বর বা রিউমেটিক ফিভারঃ এটি ৫-১৫ বছর বয়স্কদের মধ্যে বেশি হয়ে থাকে। ইহা জয়েন্ট, চামড়া, হৃদপিন্ড ইত্যাদিতে প্রদাহ সৃষ্টি করে। এটি স্টেপটোকক্কাস নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়ে থাকে। এর ফলে জ্বর হয়, ব্যাথা হয়, ব্যাথা শরীরে স্থানান্তর হয়, চামড়া লালচে হয় ও চামড়ার নীচে রেশ দেখা যায়। এতে হার্টবিট অনিয়মিত হয়ে থাকে। সময় স্বল্পতার কারনে পুরো বিষয় বর্ণনা করা সম্ভব হলো না। পরবর্তী কোন এক সময় বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ
আর্থাইটিস রোগের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাঃহোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় উপরোক্ত সকল প্রকার বাত রোগ আরোগ্য হয় ইনশাআল্লাহ্।এলোপ্যাথি চিকিৎসায় এ রোগগুলো আরোগ্য না হলেও হোমিওপ্যাথিতে রয়েছে, যা মহান আল্লাহপাকের ইচ্ছায় শতভাগ ভাল হয় তাও আবার বিনা অপারেশনে কম সময়ে, কম খরচে।সঠিক ওষুধ নির্বাচনে এ রোগের চিকিৎসায় মাত্র ০১ মাস থেকে ০৬ মাসের (সর্বনিম্ন) মধ্যে মহান আল্লাহপাকের ইচ্ছায় সারা জীবনের জন্য সম্পুর্ন আরোগ্য লাভ করা যায়।
হোমিওপ্যাথিতে সাধারনত নিম্নলিখিত ওষুধগুলো লক্ষণভেদে প্রয়োগ করা হয়ে থাকেঃ-
রাসটক্স
ব্রায়োনিয়া
আর্নিকা
ক্যাল কার্ব
ক্যাল ফ্লোর
ব্রোমাইড
ক্যালি কার্ব
লিডাম
কলোফাইলাম
কুপ্রাম
এবিস
কলচিকম ইত্যাদি।সঠিক ডাক্তার খুঁজে নিন।সঠিক সিদ্ধান্ত বুঝে নিন।পরিবার, সন্তান আপনার, বিবেচনা-ফলাফল এর দায়’ও আপনার!সবাই সুস্থ থাকুন।

পর মুখ পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। টানা কয়েকদিনের ব্যবহারে আপনার মুখের দাগ উধাও হয়ে যাবে।
You must be logged in to post a comment.